বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে ইতিবাচক ও নেতিবাচক সূচকের দ্বৈত চাপে রয়েছে। বিশ্বব্যাংকের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেছেন, সার্বিকভাবে অর্থনীতি সংগ্রাম করছে এবং একই সঙ্গে সাধারণ মানুষের জীবিকাও চ্যালেঞ্জের মুখে। ড. জাহিদ হোসেন বলেন, দীর্ঘমেয়াদি উচ্চ মূল্যস্ফীতি, প্রকৃত মজুরি নিম্নমুখী, কর্মসংস্থানে স্থবিরতা, রপ্তানিতে শ্লথগতি এবং বিনিয়োগে ভাটা এই মুহূর্তে নেতিবাচক সূচক হিসেবে কাজ করছে। তবে তিনি উল্লেখ করেন, পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারত, কিন্তু তা হয়নি।
সোমবার (৮ ডিসেম্বর) রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের এনইসি সম্মেলনকক্ষে পরিকল্পনা কমিশন আয়োজিত ‘বাংলাদেশের অর্থনীতির অবস্থা ২০২৫ এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার অগ্রগতি প্রতিবেদন ২০২৫’ প্রকাশ উপলক্ষে আয়োজিত সেমিনারে ড. জাহিদ হোসেন এসব মন্তব্য করেন। সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ-জিইডির সদস্য (সচিব) ড. মনজুর হোসেন। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন অতিরিক্ত সচিব ড. মুনিরা বেগম।
আলোচনায় অংশ নেন সিপিডির সম্মানীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান, বিশ্বব্যাংকের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মাহবুবুল্লাহ। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন পরিকল্পনা সচিব এস এম শাকিল আখতার, এনবিআর চেয়ারম্যান এম আবদুর রহমান খান, অর্থ বিভাগের সচিব ড. খায়েরুজ্জামান মজুমদার, এসডিজি প্রধান সমন্বয়ক লামিয়া মোরশেদ, প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব মোহাম্মদ শফিকুল আলম এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর। প্রধান অতিথি ছিলেন অর্থ মন্ত্রণালয়ের বিশেষ সহকারী ড. আনিসুজ্জামান চৌধুরী।
ড. জাহিদ হোসেন বলেন, ইতিবাচক সূচকের মধ্যে রেমিট্যান্স প্রবাহ নতুন উচ্চতায় ওঠা, অর্থপাচার কমে আসা, রাজস্ব আদায়ে গতি বৃদ্ধি এবং বিদ্যুৎ সরবরাহ মোটামুটি স্থিতিশীল থাকা উল্লেখযোগ্য। এছাড়া প্রাকৃতিক ঝুঁকিতে অর্থনীতি সাময়িকভাবে নড়লেও গ্রাস করেনি। তবে দীর্ঘমেয়াদি উচ্চ মূল্যস্ফীতি, প্রকৃত মজুরি নিম্নমুখী, কর্মসংস্থানে স্থবিরতা, রপ্তানিতে শ্লথগতি এবং বিনিয়োগে ভাটার কারণে নেতিবাচক চিত্র আরও ভারী। বিশ্বব্যাংকের দারিদ্র্য মূল্যায়ন তুলে ধরে তিনি জানান, দেশে দরিদ্র ও নতুন দরিদ্র উভয় শ্রেণির সংখ্যাই বেড়েছে।
ড. জাহিদ হোসেন আরও তিনটি কারণে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়নি বলে উল্লেখ করেন। প্রথমত, দেশের সামাজিক রেজিলিয়েন্স শক্তিশালী; ২০২৪ সালের ৫-৮ আগস্ট রাষ্ট্রীয় কাঠামো প্রায় অচল থাকা সত্ত্বেও অর্থনীতি ভেঙে পড়েনি। দ্বিতীয়ত, অন্তর্বর্তী সরকারের রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনা তুলনামূলকভাবে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশ তৈরি করেছে। তৃতীয়ত, সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় অতীতের ‘আত্মঘাতী আচরণ’ এখন মন্দা অবস্থায় রয়েছে, যা স্থায়ী হওয়া প্রয়োজন। তিনি বলেন, সংস্কার শুধু ইচ্ছার ওপর নির্ভর করে না; রাজনৈতিক স্ট্যামিনা না থাকলে তা মাঝপথে ‘হ্যাং’ হয়ে যায়।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের বিশেষ সহকারী ড. আনিসুজ্জামান চৌধুরী বলেন, মূল্যস্ফীতিকে ৫ শতাংশে নামাতে হলে সুদের হার আরও বাড়ানো প্রয়োজন। তিনি জানান, দেশের বিশাল অনানুষ্ঠানিক খাত নীতিগতভাবে কঠোর প্রয়োগের দাবি রাখে। প্রেস সচিব মোহাম্মদ শফিকুল আলম বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরের দুর্বলতা দূর না করলে ‘ম্যানুফ্যাকচারিং রেভল্যুশন’ সম্ভব নয়। তিনি অভিযোগ করেন, গণমাধ্যম কিছু ‘টিনি গ্রুপ’-এর মতামতকে অযথা প্রাধান্য দিয়েছে।
অন্যদিকে এনবিআর চেয়ারম্যান এম আবদুর রহমান খান জানান, এনবিআর বিলুপ্ত করে গঠিত ‘রাজস্ব নীতি’ ও ‘রাজস্ব ব্যবস্থাপনা’ বিভাগ ডিসেম্বরের মধ্যেই কার্যক্রম শুরু করবে। তিনি বলেন, স্বাধীনভাবে নীতি প্রণয়নের মাধ্যমে রাজস্ব বৃদ্ধি ও বৈষম্য দূর করা সম্ভব হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর জানান, দায়িত্ব নেওয়ার সময় অর্থনীতি বহুমুখী চাপে ছিলউচ্চ মূল্যস্ফীতি, ডলারের সংকট, রিজার্ভ হ্রাস, চলতি হিসাবে ঘাটতি এবং ব্যাংকিং খাতে সুশাসনের অভাব। দুই দিনের মধ্যে দেশি-বিদেশি ব্যাংকারদের সঙ্গে বৈঠক করে বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখা সম্ভব হয়েছে এবং পেমেন্ট ব্যালান্স পজিটিভ হয়েছে। রিজার্ভ ১৭ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ২৭ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে।
তবে তিনি জানান, মূল্যস্ফীতি এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। আর্থিক খাতে সুশাসন ফিরিয়ে আনতে ৪০টি ব্যাংকের বোর্ড পরিবর্তন, প্রকৃত খেলাপি ঋণ ৩৫.৬ শতাংশ প্রকাশ, লোকসানকারী ব্যাংকে বোনাস বন্ধ এবং মূলধন ঘাটতি না মেটা পর্যন্ত লভ্যাংশ নিষিদ্ধসহ কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।